রিফাত হত্যা: যখন যেভাবে যা হয়েছিল

ডেস্ক রিপোর্ট
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:54 AM, 30 September 2020

বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ) হত্যা মামলার রায় আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর)। হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে কী ঘটেছিল রিফাত হত্যা মামলার পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ায়। কীভাবে সম্পন্ন হলো বিচারিক কার্যক্রম। পুরো ঘটনা চক্রটি তুলে ধরা হলো:

হত্যাকাণ্ড

২০১৯ সালের ২৬ জুন সকালে একটি হত্যাকাণ্ড নজর কেড়েছিল সারাদেশের। কিশোর গ্যাং বন্ড বাহিনীর হাতে খুন হতে হয় শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ)-কে। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ তাদের অনুসারীরা। সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি এ সময় প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন রিফাতকে বাঁচানোর। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে রিফাতকে বরগুনা সদর জেনারেল হাসপাতালে ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন বিকালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রিফাত।

মামলা দায়ের

ঘটনার পর দিন ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত রিফাতের বাবা আ. হালিম দুলাল শরীফ। এ সময় মিন্নিকে সাক্ষী করা হয়। মামলাটিতে ক্রম অনুযায়ী আসামি হয়—সাব্বির আহমেদ নয়ন (নয়ন বন্ড) (২৫), মো. রিফাত ফরাজী (২৩), মো. রিশান ফরাজী (২০), চন্দন (২১), মো. মুসা, মো. রাব্বি আকন (১৯), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রায়হান (১৯), মো. হাসান (১৯), রিফাত (২০), অলি (২২) ও টিকটক হৃদয় (২১)।

পুলিশি কার্যক্রম

রিফাত শরীফের ওপর হামলার দিন সন্ধ্যায় এক কিশোরকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পুলিশ এ ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার শুরু করে। পর্যায়ক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ও পুলিশ সুপারের দিক নির্দেশনায় একে একে সব আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ক্রসফায়ার

২০১৯ সালের ২ জুলাই ভোরে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। এ সময় পুলিশ জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ভোর চারটার দিকে বরগুনা সদর থানার পুলিশ নয়ন বন্ডকে গ্রেফতারের জন্য ওই গ্রামে যায়। ওই গ্রামের খলিল মাস্টারের বাড়ির সামনে গেলে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নয়ন নিহত হয়। হামলায় বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহানসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হন। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

রিফাতের বাবার সংবাদ সম্মেলন

রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় পুত্রবধূ আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত উল্লেখ করে তাকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান রিফাতের বাবা আ. হালিম দুলাল শরীফ। এ সময় তিনি মিন্নির জড়িত থাকার বিষয়ে ১০টি কারণ উল্লেখ করেন। কারগুলো হলো:

১. নয়নের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের ঘটনা সে ও তার পরিবার কৌশলে গোপন করে গেছে।

২. বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় শরিয়া বহির্ভূতভাবে মিন্নি আমার ছেলে রিফাতকে বিয়ে করেছে।

৩. রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও মিন্নি নয়নের বাসায় যাওয়া আসা করে এবং নিয়মিতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে; নয়ন বন্ডের মা একাধিক সংবাদ মাধ্যমকে এ বিষয়সহ আরও অনেক তথ্য দিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

৪. এরই ধারাবাহিকতায় মিন্নি ঘটনার আগের দিন ২৫ জুন সকাল আনুমানিক ৯টায় এবং সন্ধ্যায় নয়নের বাসায় যায় বলে আমি জানতে পেরেছি।

৫. মিন্নি অন্যান্য দিনে রিফাতকে ছাড়া কলেজে গেলেও ঘটনার দিন রিফাতকে কলেজে ডেকে নিয়ে যায়।

৬. রিফাত ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে মোটরসাইকেলে কলেজ থেকে মিন্নিকে নিয়ে আসার জন্য গেলে মিন্নি মোটরসাইকেল পর্যন্ত এলেও চক্রান্তকারীদের উপস্থিতি না দেখে কালক্ষেপণের জন্য পুনরায় কলেজের দিকে ফিরে যাচ্ছিল এবং রিফাত মিন্নিকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিল; যা ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে আপনারা জানতে পেরেছেন।

৭. মিডিয়ায় প্রকাশিত নতুন ভিডিও ফুটেজে দেখলাম প্রথমে যখন আমার প্রিয় ছেলেকে রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী ও অন্যরা জাপটে ধরে মারপিট করতে করতে পূর্ব দিকে নিয়ে যায়, তখন মিন্নি অত্যন্ত সাবলিল ভঙ্গিতে পেছনে পেছনে হাটছিল, যা একজন স্ত্রীর ক্ষেত্রে কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ ছিল না।

৮. এছাড়া মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, স্বামীকে কোপানোর সময় মিন্নি আসামিকে জাপটে ধরেছে, কিন্তু আসামি নয়নসহ অন্যন্য আসামিদের কেউই একটি বারের জন্যও মিন্নির ওপর চড়াও হয়নি এবং কোনোভাবেই মিন্নি আক্রান্ত হয়নি।

৯. যখন তার স্বামী রিফাত আহত এবং রক্তাক্ত অবস্থায় একা একা রিকশায় হাসপাতালে যাচ্ছিল, তখন মিন্নি তার ব্যাগ ও স্যান্ডেল গোছানোর কাজেই ব্যস্ত ছিল এবং আসামিদের একজন রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে মিন্নির হাতে দিচ্ছিল।

১০. তাছাড়া আমার প্রিয় ছেলে রিফাত শরীফকে অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় মিন্নি রিফাতের সঙ্গে বরিশাল যায়নি।

মিন্নির সংবাদ সম্মেলন

১৪ জুলাই বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা মাইঠা এলাকায় নিজস্ব বাসভবনে শ্বশুরের অভিযোগ অস্বীকার করে সংবাদ সম্মেলন করেন আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। এ সময় তিনি বলেন, ‘০০৭ গ্রুপ বরগুনায় যারা সৃষ্টি করেছেন তারা খুবই ক্ষমতাবান ও অর্থশালী। তাই তারা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য আমার শ্বশুরকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে রিফাত হত্যার বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে। আমি মনে করি, খুনিদের আড়াল করতেই আমার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’ এ সময় তিনি তার শ্বশুরের করা সংবাদ সম্মেলনকে ভিত্তিহীন দাবি করেন।

মিন্নি গ্রেফতার

২০১৯ সালের ১৬ জুলাই সকাল পৌনে ১০টার দিকে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেলের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম মিন্নিকে বরগুনা পৌর শহরের মাইঠা এলাকার তার বাবার বাড়ি থেকে পুলিশ লাইনে নিয়ে আসে। এ সময় তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরকেও সঙ্গে নিয়ে আসা হয়। তবে বেলা ১১টার পর মিন্নির কাছ থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে রিফাত শরীফকে হত্যার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। রাতে বরগুনার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন।

মিন্নির জামিন

২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির দুটি শর্তে জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট। শর্ত দুটি হলো—মিন্নি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না ও তাকে তার বাবার জিম্মায় থাকতে হবে। হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। জামিনে থাকা অবস্থায় মিন্নি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললে তার জামিন বাতিল হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করেন আদালত।

পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল (চার্জশিট)

রিফাত হত্যাকাণ্ডের দুই মাস ছয় দিন পর গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত করে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করেন পুলিশ। এদের মধ্যে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। একইসঙ্গে রিফাত হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

চার্জ গঠন

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। অন্যদিকে গত ৮ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার শিশু আদালত।

সাক্ষ্যগ্রহণ

চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত। মামলার প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ, ডাক্তার ও সিআইডি কর্মকর্তাসহ ৭৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ২৫ ফেব্রুয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও রায়ের তারিখ নির্ধারণ

সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থান করেন। এরপর আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক খণ্ডন করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। পুনরায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামি পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক খণ্ডন করেন ১৬ সেপ্টেম্বর। এই দিনই আদালতের বিচারক রিফাত হত্যা মামলার তারিখ নির্ধারণ করেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির রায় ঘোষণার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন আদালত।

আপনার মতামত লিখুন :