রকিবুল আমিনের গল্প ‘ যদি এমন হতো’

সাইফুল ইসলাম বারী, টাঙ্গাইল জেলা সংবাদদাতা:
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  07:31 PM, 01 September 2020

কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লার দৌলতপুরের ছোট্ট কুটিরে বসে কবিতা লিখছে। আশেপাশে কি হচ্ছে সে দিকে তার খেয়াল নেই। নার্গিস এসে কবি কে কবিতা রচনা করতে দেখে একটি কথাও বলল না। বরং চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কবির খুঁজে যে লোক এসেছে, সে কথাও কবি কে জানালো না। বাইরে অপেক্ষমান ছেলেটিকে বারান্দার এক কোণে বসতে দিল নার্গিস। নার্গিসের উপড় ছেলেটি যে বিরক্ত তা বুঝতে বাকী রইলোনা। সেই কখন থেকে কবির সাথে দেখা করতে বসে আছে তার হিসেব নেই। ছেলেটির বিরক্ত ভরা মুখ দেখে নার্গিস বলল, দেখেন! আমি ইচ্ছে করে আপনাকে বসিয়ে রাখিনি। কবি ঘরে বসে গভীর মনযোগ দিয়ে কবিতা লিখছে। আমি চাইনে কবির এই মনযোগ নষ্ট করতে। তার সাহিত্য রচনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে। নার্গিসের কথা শুনে ছেলেটি মুখ শুকনো করে বলল, না! না! কোন অসুবিধে নেই।
আপনার নাম কি?
রতন।
কবির কাছে কেন এসেছেন?
একটি চিঠি নিয়ে।
কে চিঠি দিয়েছে জানতে পারি?
জ্বি।
কে?
আমার কর্তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কতক্ষন এভাবে বসে থাকবেন। তারচেয়ে বরং চিঠিখানা আমার কাছে দিয়ে যান।
না! না! এ চিঠি অন্যকারো হাতে দিতে মানা করেছে। কর্তা বাবু বার বার করে বলে দিয়েছে চিঠিখানা যেন সরাসরি কবির হাতেই দেই।
ঠিক আছে আপনার যেমন ইচ্ছে?
কথা শেষ করে আবারো কবির গৃহে প্রবেশ করলো নার্গিস। বালিশে পিঠ রেখে আধশোয়া অবস্থায় চোখ বন্ধ করে আছে কাজী নজরুল ইসলাম। ধীরে ধীরে কবির কাছে গিয়ে বসলো নার্গিস।
তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?
না।
তোমার সাথে দেখা করতে একটি ছেলে এসেছে। অনেকক্ষণ যাবত বারান্দায় বসিয়ে রেখেছি।
ছেলেটি কে ! কোত্থেকে এসেছে?
নাম রতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঠিয়েছে।
বল কি? এ কথা আমাকে আগে বলোনি কেন? কথা শেষ করে তড়িঘড়ি করে ঘরের বারান্দায় এলো কাজী নজরুল ইসলাম। রতন কে কথা বলার কোন সুযোগই দিলোনা।
আমি অত্যন্ত লজ্জিত তোমাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখেছি। আসলে ” পথিক প্রিয়া “নামে একটি কবিতা লিখলাম। যে কারনে অন্য কোন দিকে খেয়াল দিতে পারিনি।
এবার বল কি বলবে?
আপনাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই চিঠিখানা পাঠিয়েছে। দুইদিন পর আপনাকে শাহজাদপুর কর্তার জমিদার বাড়িতে যেতে বলেছে। আপনার সাথে প্রাণখুলে নাকি আড্ডা দিবে।
আমি এখন যাই?
সে কি! এক্ষুনি চলে যাবে।
জ্বি জনাব। আমাকে আবার এখান থেকে বরিশাল যেতে হবে।
বরিশাল কেন?
জীবনান্দ বাবুর কাছে।
জীবনান্দ দাশের কাছে কেন?
তাকেও আড্ডায় আসার জন্য নিমন্ত্রন করে চিঠি দিয়েছেন।
বেশ! ভালো। দুটো দানা পানি মুখে দিয়ে যাও।
আজ না জনাব। আরেকদিন।
ছেলেটি কথা শেষ করে কেমন শন শন গতিতে হেঁটে যাচ্ছে বারান্দায় দাড়িয়ে তাই দেখছে কাজী নজরুল ইসলাম।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকালে ঘুম থেকে উঠে বাগানে হাটাহাটি করছে। বাড়ির বাগানে ফুটে থাকা ফুলগুলোকে ছুঁয়ে দেখছে। সবুজ পাতায় ভরা নিমের চারাটি হেলে পড়েছে। বাগানের মালীকে না ডেকে নিজের হাতে নিমের চারার মেরুদন্ড সোজা করে দিলেন। দু ‘হাতের পরশে ছোট্ট চারাটিকে আদর করলেন। দূর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে বাগানের গাছপালার পরিচর্যা করতে দেখে মালী কিছুটা লজ্জা পেল। দৌড়ে এল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। কর্তা আপনি একি করছেন? বাগানের যত্ন নেয়ার জন্য তো আমি আছি।
তাতে কি! নিজ হাতে বৃক্ষের পরিচর্যা করতে ভীষণ ভালো লাগে। এ জীবনে কতকিছু নিয়েই তো গল্প, কবিতা লিখলাম। এবার নিয়ত করেছি বৃক্ষ নিয়ে গল্প লিখবো। নাম দেবো “বলাই “। কেমন হবে বলতো!
গল্প, কবিতার আমি তেমন কিছুই বুঝিনা কর্তা। তয় মন বলছে, কামডা অনেক বালা।
রতন ফিরেছে?
জ্বি কর্তা।
এখানে আসতে বল।
জ্বি আচ্ছা।
মালী দৌড়ে বাগান থেকে বেরিয়ে গেল রতন কে ডাকতে। কোনকিছু ভেবে উঠার আগেই রতন এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে দাড়ালো। চোখ দুটো লাল। দেখে মনে হয় ঘুম কাতুরে। শরীরটাও কেমন রোগা রোগা মনে হচ্ছে।
আমায় ডেকেছেন কর্তা?
হ্যা।
চিঠিগুলো সবাইকে ঠিকমতো দেয়া হয়েছে?
জ্বি কর্তা।
কাজী নজরুল কে পেয়েছিলে?
জ্বি। উনি আসতে সম্মতি দিয়েছেন।
আর বাকী সবাই?
জীবনান্দ দাশ,জসিম উদ্দিন, উনারাও আসবেন। হুমায়ূন আহমেদ কে বাসায় পাইনি। সিনেমা বানানোর জন্য ঢাকার বাইরে আছেন। চিঠি বাড়িতে রেখে এসেছি।
শরৎ বাবু আর সুনীলের খবর কি? ওদের টেলিগ্রাম করে ছিলে?
জ্বি কর্তা।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনি আসতে পারবেন না। ফিরতি টেলিগ্রাম করে তাই জানিয়েছেন।
আসতে পারবে না কেন?
উনার শরীরটা নাকি আজকাল ভাল যাচ্ছে না।
সুনীলের কোন টেলিগ্রাম এসেছে?
জ্বি না কর্তা।
আচ্ছা যা এবার আরাম করে ঘুমা। তোর তো অনেক খাটা খাটনি গেল। মন খারাপ করিসনা। তোকে আমি বিখ্যাত করে দিয়ে যাবো রতন। একদিন বাংলা সাহিত্যে তুই হবি জনপ্রিয় এক চরিত্র।
কেমনে কর্তা!
আমি ঠিক করেছি ” পোষ্ট মাষ্টার ” নামে একটি গল্প লিখবো। সেই গল্পের প্রধান চরিত্র হবে রতন। আমার মন বলছে গল্পটা মানুষের হৃদয় কে স্পর্শ করবে।
এতসব আপনার মাথায় আসে কেমনে কর্তা?
তোকে দিয়ে চিঠি পৌছানোর ভাবনা থেকেই গল্পটা মাথায় এসেছে।এবার যা আরাম করে ঘুমা। কাল আবার তোকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। সবার খাবার দাবার থেকে শুরু করে সব ভালো মন্দের ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদ পুরের কুঠি বাড়ীর ছাদে বসে আছে। ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে বাড়ীর প্রধান ফটক অতিক্রম করতে দেখেই হাত ইশারা করে ছাদে আসতে ইঙ্গিত দিলেন। ধীর পায়ে সিড়ি বেয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এল সিরাজী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশের চেয়ারটায় বসল।
কি ব্যাপার শুরু! কেউ আসেনি। আমি তো ভেবেছি, আমার পরে আর কেউ নেই। যাক বাঁচা গেল। আমি সবার থেকে কাছে, সবার আগেই এসেছি। এবার অন্তত্য কেউ বলতে পারবে না, মক্কার মানুষ হজ্জ পায়না।
এত বেশি খুঁশি হইয়োনা সিরাজী। তোমার আগে জীবনান্দ বাবু এসেছে । বহুপথ পেরিয়ে এসেছে তো সেজন্য একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা শুনে মূর্হুতেই সিরাজীর খুঁশি বিলীন হয়ে গেল। নাহ্! এবারো আগে আসা হলোনা।
বাকী সবার খবর কি শুরু?
বুঝতে পারছিনা। আর কিছু সময় দেখি। কেউ না এলে জীবনান্

কি ব্যাপার গুরু! কেউ আসেনি। আমি তো ভেবেছি, আমার পরে আর কেউ নেই।

আপনার মতামত লিখুন :