প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বাজেট২০২০-২০২১_রাশেদ রেহমান

কবির মাহমুদঃ ব্যুরো চীফ-রাজশাহী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  06:40 PM, 03 July 2020

সবার আগে পৃথিবীর সুস্থতা প্রয়োজন। সুস্থতা প্রয়োজন দেশ মানুষ ও অসুস্থ মানসিকতার। মার্চ ২০২০ থেকে টানা সারে তিনমাসের লকডাউনে যখন নিম্ন আয়ের মানুষ তথা জনজীবন অতিষ্ঠ। ঠিক সেই সময়ে সরকারে লেগে থাকা ধনিকশ্রেণির জনগোষ্ঠীর ফাঁদে পড়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একষট্টি দিনের পুরো প্লান ভেস্তে যায়। তেমনি ঘোষিত বাজেটে জনমত ও জনমনের প্রত্যাশার প্রাপ্তিযোগ না ঘটলেও আমরা নিরুপায়। মহামারী সময়ে

৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা অর্থের সামান্য ঘাটতি থাকলেও সাহসের কোন ঘাটতি নাই।

করোনা ক্রান্তিকালীন বাজেটে মানুষের প্রত্যাশা ছিল –

সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হবে স্বাস্থ্যসেবায়-
এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কৃষি খাতে,
যাতে মানুষ মাছ না পেলেও বাঁচে ভাতে।

করোনার (কোভিড ১৯) চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাজের ধনী-দরিদ্র শুধীজন সুশীল নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ একবাক্যে স্বীকার করবেন – অন্তত এই ভাইরাস দূর্যোগের ঘনঘটায় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ ও বিশেষ বরাদ্দ থাকবে। এরপরেই আসে মানব সম্পাদ উন্নয়ন ও কৃষি।

করোনা এমন একটি অদৃশ্য মহামারী যা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে ভয়ংকর । যার নির্দিষ্ট কোন মাত্রা স্থান সময় ও আকার নেই। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জনবান্ধব ও উন্নয়নমুখী বাজেট দুষ্কর হলেও বাজেট নিয়ে আমাদের ভাবনার অন্তরালের সরকারের শুভদৃষ্টির প্রতিফলন কতটুকু পর্যবসিত সেটায় দেখার বিষয়।

বৈশ্বিক অস্থিরতা মহামারী করোনায় যখন জনজীবন বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিল ছড়িয়ে পৃথিবীময় ঠিক সেইসময় ঘোষিত হল বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট । তাতে মোট প্রারম্ভিক ব্যয় ধরা হয় ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ। মোট রাজস্ব আয় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা দেখানো হয়, বিদেশি উৎস থেকে সহায়তা ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

বাজেট কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়ক এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুদৃঢ়করণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মৌলিক চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এটাই মানুষের প্রত্যাশা। বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে ১১.৬৯%।

করোনায় সরকার ঘোষিত লকডাউনে মার্চ ২০২০ থেকে স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি মানুষ, সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত কোমলমতি ছাত্র/ছাত্রী তথা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা। তা থেকে উত্তোরণের জন্য বাজেটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পাশাপাশি শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসৃষ্টি , উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এটাই প্রত্যাশা। বাজেট প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রভাবের কারণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ১,০৩,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ অথচ! শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আশানুরূপ নয় ।

বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রায় ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেশি দেখানোর জন্য অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে একত্রে গুলিয়ে শিক্ষা ও প্রযুক্তি মিলিয়ে ৮৫,৭৬০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৫.১০% । আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ খুশি হলেও ভয় ও সঙ্কা থেকেই যায় কি হবে শিক্ষা ব্যবস্থায়।

বাজেটে প্রাথমিক, গণশিক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সবমিলিয়ে মোট বরাদ্দ ৬৬, ৪০১ কোটি টাকা । শিক্ষা খাতে প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ মাত্র ১১.৬৯ শতাংশ, যা গত বাজেটের তুলনায় ০.০১% বেশি। মূল্যস্ফীতি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় প্রকৃত অর্থে কম।

করোনাকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কার্যক্রমের আওতায় জরুরি শিক্ষা পরিচালনায় যে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার ধারাবাহিকতা রক্ষায় শিক্ষার নতুন চাহিদা পূরণের জন্য শিক্ষকদের প্রস্তুত রাখা।

গণসাক্ষরতা আন্দোলনে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে অন্তত ১৫% বরাদ্দ দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ থাকলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট উন্মুক্ত আবেদন এবং অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো স্মারকলিপিতে গণসাক্ষরতার পক্ষে বলা হয়েছে- স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মতো ২০২০-২০২১ অর্থবছর থেকে আগামী ২-৩ বছর মেয়াদি একটি শিক্ষা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি প্রণয়ন প্রয়োজন । যার ফলে কোভিড ১৯- এর প্রভাবে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ।

এবারের বাজেটে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশার অন্যতম ছিল শিক্ষায় আইসিটির ব্যবহারের অগ্রগতি। বিশেষ করে গত ১৮ই মার্চ থেকে বন্ধ থাকা সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংসদ টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবহার করে যে বিকল্প দূরশিক্ষণ পদ্ধতি চালু হয়েছে তার সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। সঙ্গে রেডিও এবং মোবাইল ফোন প্রযুক্তি সম্পৃক্ত হলে শিখন ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে যাবে। কোভিড পরবর্তী পর্যায়েও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

শিক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালায় শিক্ষকদের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া, নন-এমপিও শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে শিক্ষাক্ষেত্রে উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি লক্ষ রেখে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা,সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে ন্যূনতম ১৫% বরাদ্দ দেওয়া সময়ের দাবি। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম প্রসারের বর্তমান বাজেটে প্রতিবন্ধীদের ভাতা বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে তার সুবিধা শিক্ষার্থীরা পাবে।

বাজেট বিষয়ে বিশদ আকারে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও বিশ্লেষণে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও উপস্থাপনে অপ্রতুলতার কারণে দীর্ঘ আলোচনা না করলেও এটুকু বলতে
পারি -বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সরকার অন্যান্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় যুক্ত করে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি দেখিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭,৯৪৬ কোটি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ১,৪১৫ কোটি টাকাসহ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৮৫,৭৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখিয়েছে।

রাশেদ রেহমান
কবি,কথাসাহিত্যিক ও চলচিত্র পরিচালক।

আপনার মতামত লিখুন :